শানানো কাস্তের আরেক নাম হেমাঙ্গ বিশ্বাস
এইদেশ সংগ্রহ , বুধবার, ডিসেম্বর ২৬, ২০১২


-কাস্তেটারে দিও জোরে শান কিষাণ ভাইরে/ কাস্তেটারে দিও জোরে শান/ ফসল কাটার সময় এলে কাটবে সোনার ধান/ দস্যু যদি লুটতে আসে কাটবে তাহার জান রে--- হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান কিষাণের কাস্তের মতই বাঁকা এবং খাঁজ কাটা ধারালো- ব্লেডের মত মসৃন ধারালো নয়। তার গানের কথা, ছন্দ ও সুর থেকে শ্রমিকের হাতুড়ির ধাতব শব্দ উঠে। আমাদেরকে আবেশে ভাসিয়ে নিয়ে যায়না, প্রচন্ড আঘাত করে আমাদের জীর্ণতাকে খসিয়ে ফেলে; কামারের বলিষ্ঠ পেশীতে পিটিয়ে পিটিয়ে আমাদের ম্রিয়মান চেতনাকে ক্ষুরধার বিপ্লবী চেতনায় রুপান্তরিত করে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কন্ঠে উচ্চারিত গান আমাদের হাতে শোষণ বিধ্বংসী যুদ্ধাস্ত্র হয়ে নেমে আসে।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সর্বত্র পরিচয় একজন সঙ্গীত শিল্পী, গীতিকার, সুরস্রষ্টা এবং এই বাংলায় গনসঙ্গীতের অন্যতম পুরোধা হিসেবে। এই সব নানাবিধ পরিচয়ের অন্তরালে গুপ্ত থেকে গেছে একজন কবির প্রতিমূর্তি। তার প্রত্যেকটি ছন্দোবদ্ধ লেখা যেমন সুরে, সঙ্গীতে, মূর্ছনায় মনপাখির বুকে আগুন ধরানো একেকটি গান হয়ে উঠেছে তেমনি হয়েছে একেকটি কালজয়ী কবিতা। অনেক বড় বড় কবির কবিতাও অনেক সময় তার সুররসিক লেখার কাছে যেন ম্লান মনে হয়। হিরোশিমায় আনবিক বোমা ফেলার বিরুদ্ধে তার কবিত্বময় উচ্চারণ- সুদূর প্রশান্তের বুকে/ হিরোশিমা দ্বীপের আমি শঙ্খচিল/ আমার দু ডানায় ঢেউয়ের দোলা/ আমার দু’চোখে নীল শুধু নীল।

তার গান-কবিতার মধ্যে দেখা যায় শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন, অত্যাচার, জুলুম, ভন্ডামীর বিরুদ্ধে শানিত তলোয়ারের ঝলসানি। সহযোদ্ধাদের সাথে করে সেই কোষহীন তলোয়ার দৃঢ় কন্ঠীতে তুলে ধরে তিনি হেঁটে বেড়িয়েছেন শহরে, গ্রামে, লোকালয়ে- কৃষক, শ্রমিক, মজুর, ছাত্র, যুবক, জনতার মাঝে। চেতনায় সুর, সঙ্গীত ও কবিতার ধাক্কা খেয়ে শোষিত-বঞ্চিত মেহনতী মানুষ হুড়মুড় করে জেগে উঠেছে। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা মানুষকে তিনি দেখিয়েছেন স্পর্ধার সাহস আবার তাদের কাছ থেকেই নিয়েছেন গানের কথা, সুর ও সঙ্গীত; তার খোলা তলোয়ার হয়ে উঠেছে আরো বেশী ধারালো। লড়াইটা একা করতে চাননি কখনো, যাদের জন্য লড়াই তাদের সাথে নিয়েই সারাটা জীবন যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে লড়ে গেছেন। আর যাদের বিরুদ্ধে তার লড়াই তাদেরকে পুরোপুরি প্রতিপক্ষই ভেবেছেন মনে-প্রাণে। বুর্জোয়াদের প্রথা- প্রতিষ্ঠানের কাছে নতজানু হওয়ার চেয়ে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করেছেন। মরণব্যাধি যক্ষাক্রান্ত হয়েও, “কখনো মেহনতী মানুষের পাশে দাড়াবোনা” এই মর্মে দাসখত দিতে অসম্মত হয়েছিলেন। আপোষের স্নিগ্ধ মধুর ছায়ায় একমূহুর্তের জন্যেও তাকে কখনো বিশ্রাম নিতে দেখা যায়নি।

চল্লিশের দশকের মধ্যভাগে তিনি ফুসে উঠেছিলেন সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জনে। তেভাগা আন্দোলনে তার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ গনসঙ্গীত কৃষকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বারুদে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের উলঙ্গ বিস্ফোরনের সময় বিপ্লবী গনসঙ্গীত তাদেরকে কিভাবে অনুপ্রানিত করতে পারে তা তিনি দেখিয়েছিলেন ঐ সময়কার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে।

শোষণের প্রশ্নে তিনি দেশকালের সীমানাকে তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দিয়ে- যেখানে জুলুম দেখেছেন সেখানেই তিনি দৌড়ে গেছেন তার সুচাগ্র উচ্চারণের তীরকে কন্ঠের টান টান ধনুকের সাথে কষে বেঁধে। নির্যাতিত মানুষদের নিয়ে লেখা ভিন্ন ভাষার গান এমনভাবে নিজের কন্ঠে সমানুভূতির ছোঁয়ায় তুলে এনেছেন যে তার নিজের লেখা গান বলেই ভ্রান্তি হয় বার বার। -অগ্নিগিরির হলো উত্থান/ থেমে গেল হাতুড়ীর শব্দ/ হেনরীর জয়গান চারদিকে উঠে জাঁকে/ হৃদপিন্ড তার স্তব্ধ-- এখানে মনে হয় আমেরিকার নির্যাতিত শ্রমিক জন হেনরী যেন আমাদেরই হেমাঙ্গ বিশ্বাস। বাংলার জমিদার পুত্র হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে বিদেশী জন হেনরীকে আলাদা করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তার গানের মধ্যে তীব্র শ্লেষের কাস্তে-হাতুড়ি দিয়ে বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের ভন্ডামীর মুখোশকে ছিন্নভিন্ন করে জনগনের সামনে তাদের আসল স্বরুপ উন্মোচিত করেছেন। সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জগতের আর কোন মানুষই এত বড় স্পর্ধা দেখানোর সাহস পায়নি। যার বুকে নিত্য জ্বলে বিপ্লবের আগুন তার আবার কিসের ডর। তার “লর্ড মাউন্টব্যটন মঙ্গলকাব্য” এ তিনি শ্লেষের ধারালো করাত চালিয়েছেন ব্রিটিশ রাজ ভীরু কংগ্রেসের গলায়। সর্দার কান্দে, পন্ডিত কান্দে, কান্দে মৌলানায়/ করে হায় হায় হায়/ আর মাথাই যে মাথা কুটে বলদায় বুক থাপড়ায়---।

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অন্তর্গত বিপ্লবের শক্তি এতই দার্ঢ্য ছিল যে, তার সারা জীবনের চলার পথে কখনোই ভোগের পাথরের সাথে হোঁচট খেয়ে বিলাসিতার মখমলের বিছানাতে মুখ থুবড়ে পড়েন নাই। জীবনের শেষ বেলায় যখন তার যৌবনের সহযোদ্ধারা যখন বুর্জোয়া সংস্কৃতি ও রাজনীতির পুচ্ছ ধরে খ্যাতির আকাশে উড়ার স্বপ্নে বিভোর তখনও তিনি “মাস সিঙ্গারস” নামে গন সঙ্গীতের ছোট একটি গানের দল গঠন করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে-বেড়িয়ে মেহনতী মানুষকে অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলতেন। সেখান থেকে যে আয় হত তা দিয়েই তিনি সাদামাটা জীবন ধারন করতেন। বিপ্লবের বর্ণময়তায় যার অন্তর্গত জীবন ভরপুর তার দরকার পড়েনা বাহিরের চাকচিক্যের। হবিগঞ্জের জালালি কইতর সুনামগঞ্জের কোড়া/ সুরমানদীর গাঙচিল আমি শুন্যে দিলাম উড়া /--শুন্যে দিলাম উড়ারে ভাই যাইতে চান্দের চর/ ডানা ভাইঙ্গা পড়লাম আমি কলকাতার উপর--। সাতচল্লিশের দেশভাগের কারনে কলকাতার বিলাসবহুল জীবনের হাতছানির মধ্যে এসে পড়লেও, শোষনহীন সমাজ আসবেই এই স্বপ্ন বুকে পুষে সারাজীবন ধরে তিনি জালালী কইতর, কোড়া, গাঙচিলের মত আহ্বান জানিয়েছেন সকল অনাগত বিপ্লবীদের।- আমরা করবো জয়, আমরা করবো জয় একদিন/ আমাদের নেই কোন ভয়, আমাদের নেই কোন ভয় আজকে/ বুকের ভেতরে আছে প্রত্যয়/ আমরা করবো জয় একদিন--- ।